টানা ছুটিতে পর্যটক বেড়েছে ৩০%

১৫০০ কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লম্বা ছুটি ও দুর্গা পূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটিতে কয়েক লাখ পর্যটক ভিড় করেছে দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লম্বা ছুটি ও দুর্গা পূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটিতে কয়েক লাখ পর্যটক ভিড় করেছে দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে। গত বুধবার থেকে আজ পর্যন্ত টানা চারদিনের ছুটিতে কক্সবাজার, সিলেট, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, কুয়াকাটা, সুন্দরবনসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় প্রায় আট হাজার পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছরের একই সময়ের (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। আবহাওয়া খানিকটা প্রতিকূলে থাকলেও এবার ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি ছুটি বুধবার থেকে শুরু হলেও সপ্তাহের শুরু থেকেই ভ্রমণ করতে শুরু করেছেন পর্যটকরা। কক্সবাজার ও সিলেটের শতভাগ হোটেল বুকিং হলেও পর্যটক কম ছিল পার্বত্য তিন জেলায়। সাম্প্রতিক সহিংসতা ও নিষেধাজ্ঞায় বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে বুকিং হয়েছে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ হোটেল ও রিসোর্ট। এতে ৫ কোটি টাকা আয় কমেছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা। কুয়াকাটা, সুন্দরবনসহ অন্য কেন্দ্রগুলোয়ও ভিড় ছিল। তবে আগামীকাল থেকে ছুটি শেষ হওয়ায় কমতে শুরু করেছে পর্যটকের সংখ্যা।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বুধবার থেকে গত এক সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে এক লাখ পর্যটক কক্সবাজার সৈকতে ভ্রমণ করেছে। বৃহস্পতিবার প্রতিমা বিসর্জনের দিন এ সংখ্যা ছাড়িয়েছে দুই লাখ। পর্যটনসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কক্সবাজার শহরের হোটেল ও রিসোর্টে প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার মানুষের ধারণক্ষমতা রয়েছে। এর মধ্যে শহরের পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টের ৯০ শতাংশের বেশি কক্ষ আগাম বুকিং ছিল। এর বাইরেও অনেকে কক্সবাজার ভ্রমণ করেছেন, যারা হোটেলে অবস্থান করেননি।

কলাতলী বিচ এলাকার একটি হোটেলের মালিক সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘‌স্কুল-কলেজ ছুটি হওয়ায় সপ্তাহের শুরু থেকে পর্যটক আসা শুরু করে। শনিবার রাত পর্যন্ত আমাদের কোনো হোটেলে রুম খালি নেই।’

এদিকে বৈরী আবহাওয়ায় কক্সবাজারে আগত পর্যটকদের সমুদ্রে নামতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার অঞ্চলের অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব কক্সবাজারে সেভাবে পড়েনি। তবুও আমরা যেকোনো ঝুঁকিতে কাজ করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। যেসব স্থান বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সেখানে পর্যটকদের সতর্ক করেছি। সন্ধ্যার পর পর্যটকদের পানিতে নামার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা ছিল।’

সিলেটে সাম্প্রতিক পাথর চুরি কাণ্ড এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পর্যটক কিছুটা কমেছে। গত চারদিনে স্থানীয় হোটেলগুলোর বুকিং শতভাগ হলেও এ বছর পর্যটক আগের চেয়ে কম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ী সুজয় দেবনাথ বলেন, ‘‌আগের তুলনায় সিলেটে পর্যটক কম আসছেন। বিশেষ করে সাদাপাথর এলাকার পাথর চুরি কাণ্ডের ফলে ইমেজ সংকট তৈরি হয়েছে।’

খাগড়াছড়িতে সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনায় পর্যটক সংকটে পড়েছে হোটেল-মোটেল। পার্বত্য অন্য দুই জেলা বান্দরবান ও রাঙ্গামাটিতেও কমেছে পর্যটকের সংখ্যা। তবে ১ অক্টোবর থেকে বান্দরবানে অবস্থিত কেওক্রাডং পর্বত ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়ায় এ এলাকার হোটেল-মোটেল বুকিং হয়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ। তবে বিপরীত চিত্র রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির মধ্যবর্তী সাজেক ভ্যালিতে। সাজেক ভ্যালির রিসোর্ট মালিক মো. কামরুল বলেন, ‘‌সাম্প্রতিক সময়ের সহিংসতা ও কিছুদিন আগের অগ্নিকাণ্ডের কারণে এবার স্বাভাবিকের তুলনায় পর্যটক কম আসছে। তবে শীতকালের শুরু থেকে পর্যটক আসা শুরু করবে বলে আশা করি।’

এদিকে পর্যটন খাতে বড় আয়ের সম্ভাবনা দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ‌দুই ঈদের মতো এবার পূজার ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে। দুই ঈদে এবার বিদেশী পর্যটক কম এলেও দেশী পর্যটক বেশি ছিল। একই চিত্র এবারের পূজার ছুটিতেও। আশা করা হচ্ছে, এবার আট লাখের বেশি পর্যটক ভ্রমণ করবে। যেখানে বিভিন্ন খাত থেকে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আয় হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘নিরাপত্তা শঙ্কা, রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা কারণে বিদেশী পর্যটকরা আসছেন না। এর মানে এ খাতের আয় একেবারে কমে গেছে তা নয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে কমেছে। পর্যটন করপোরেশন, মন্ত্রণালয়, ট্যুরিজম বোর্ড বছর শেষে কত আয় হয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান দেয় না। ফলে অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান পরিষ্কারভাবে জানা যায় না।’

এদিকে বিগত বছরগুলোর তুলনায় এ বছর ৩০ শতাংশ পর্যটক বেড়েছে বলে মনে করেন ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সচিব নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘অন্যান্য বছরের এ সময়ের তুলনায় এবারের পর্যটকের সংখ্যা ৩০ শতাংশ বেশি। রমজানের ঈদে প্রায় আড়াই হাজার কোটি এবং কোরবানি ঈদে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি আয় হয়েছে। এবার সেটি এক থেকে দেড় হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাবে বলে আশা করছি।’

পর্যটন খাত থেকে আয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফাতেমা রহিম ভীনা বলেন, ‘ঈদ, পূজায় যেহেতু মানুষ ঘুরতে বের হয় তখন হোটেল, রেস্টুরেন্ট, পরিবহনসহ নানা খাতে আয় হয়। তবে সেটার পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে বলা যায় না। আমাদের পরিসংখ্যান ডাটাবেজ তৈরি হচ্ছে, সেটা হয়ে গেলে বছর শেষে কত আয় হয় সেটি বলা যাবে। এখন আমরা এ খাতের প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছি।’

আরও